ময়মনসিংহ প্রতিনিধি ১৩ নভেম্বর ২০২১, ১৯:২৯
জীন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা। ছিলেন ফিলিপাইনের নাগরিক। পড়াশোনা করেছেন সেখানকার নামি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিসারিজ বিভাগে। গ্রাজুয়েশন সম্পন্নের পর সিঙ্গাপুরে চাকরি করতে গিয়ে পরিচয় হয় বাংলাদেশি তরুণ জুলহাস উদ্দিনের সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রেম এরপর বিয়ে। আর ভালবাসার টানে নিজের দেশ ছেড়ে ১০ বছর আগে ছুটে আসেন বাংলাদেশে। সংসার পাতেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের অজপাড়া গাঁয়ে।
এখানেই শেষ নয়, সবাইকে চমকে দিয়ে এখন হয়েছেন তিনি জনপ্রতিনিধি। গত ১১ নভেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসনে সদস্য পদে প্রার্থী হয়েই করেছেন বাজিমাত। প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এমন ঘটনায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে পুরো জেলাজুড়ে।
নির্বাচনে জয়লাভ করার পর মোটরসাইকেলে করে স্ত্রীকে নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন জুলহাস। চাচ্ছেন সবার দোয়া। করছেন আনন্দ ভাগাভাগি।
জীন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকার জানান, ‘২০০৮ সালে ফিলিপাইনের মিন্দানাও স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি ফিসারিজ বিভাগে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। এরপর চাকরিতে যোগ দেন সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানিতে। সেখানেই চাকরি করতেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার যুবক জুলহাস। সে সময় জুলহাসের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। বছর দুয়েক পরে নিজ নিজ দেশে ফিরেন তারা। তবে তাদের মধ্যে চলতে থাকে যোগাযোগ। সিদ্ধান্ত নেন আবদ্ধ হবেন বিয়ের বন্ধনে। সেজন্য ২০১০ সালের শেষের দিকে জুলহাস পাড়ি জমান ফিলিপাইনে। সেখানে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে পেট্রিয়াকা স্বামীর হাত ধরে চলে আসেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায়। নিজের পরিবার, দেশ, ধর্ম ছেড়ে বেছে নেন এই গ্রামীণ জীবন।’
পেট্রিয়াকা বলেন, ‘১০ বছর হয়ে গেছে আমি এখানে এসেছি। বাবা-মা ছাড়া থাকতে কষ্ট হয়েছে। শুরুতে বেশ বিপাকে ছিলাম। কারণ আমি বাংলা বলতে পারতাম না। আর এখানকার মানুষ ইংরেজি বুঝে না। তবে আস্তে আস্তে শিখার চেষ্টা করেছি। এখন আমি সবার কথাই মোটামুটি বুঝি। আমিও কিছু কিছু বলতে পারি।’
নির্বাচন করার কোনো পরিকল্পনা কখনো ছিল না জানিয়ে এ নারী আরও বলেন, ‘আমি নির্বাচনে দাঁড়াতে চাই নি, ইচ্ছাও ছিল না। কিন্তু এলাকার মানুষ জোর করে বলেছে নির্বাচন করতে। তারা আমাকে খুব ভালবাসে তাই তাদের কথা রাখতেই আমি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘প্রার্থী হওয়ার পর অনেক কষ্ট করেছি। সকালে নাস্তা খেয়ে প্রচারণায় বের হয়ে সারাদিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে সন্ধ্যায় বাড়িতে এসেছি। কিন্তু জয় পাওয়ায় সব কষ্ট ঘুচে গেছে। মানুষের সেবা করার সুযোগ পেয়ে আমি খুব খুশী। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।’
একটা সময় জুলহাস মন জয় করেছিলেন ফিলিপাইন তরুণী পেট্রিয়াকার। সে কারণেই তো সব ছেড়ে তিনি পেট্রিয়াকা থেকে পরিণত হয়েছেন জেসমিন আক্তারে। তিনি রাজনীতি বুঝেন না, নন বাঙ্গালিও তবে ঠিকই জয় করেছেন এলাকাবাসীর মন। তাইতো এর প্রতিদান ব্যালটেই দিয়েছেন তারা।
মাইক প্রতীক নিয়ে নব-নির্বাচিত এ ইউপি সদস্য পেয়েছেন ৪ হাজার ৪৯৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ১ হাজার ৮৩৭ ভোট। আর মানুষের কাছ থেকে পাওয়া এমন ভালবাসায় আপ্লুত এক সময়ের ভিনদেশী এ নারী। খুশী তার স্বামী জুলহাসও।
জুলহাস উদ্দিন বলেন, ‘আমার মনের পাশাপাশি আমার স্ত্রী এলাকাবাসীর মনও জয় করতে পেরেছে। তাদের জন্যই নির্বাচন করেছে এবং তারাই জয়লাভ করিয়েছে। আমার আশা সবার সুখে-দুঃখে সবসময় পাশে থেকে সাধারণ মানুষের উপকার করে যাবে।’
ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা আসনে এলাকার পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ায় খুশি সবাই। বাড়িতে এসে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি করেছেন আনন্দ মিছিলও।
প্রায় এক যুগের সুখের সংসারে এখন দুই ছেলে-মেয়ের জননী পেট্রিয়াকা। মানিয়ে নিয়েছেন গ্রামীণ পরিবেশ। তবে, খুব বেশি ভালোভাবে রপ্ত করতে পারেননি এখনও বাংলাটা।
প্রধান সম্পাদকঃ মোহাম্মদ আবুল বশির
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মনির হোসেন
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়ঃ ৩৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫
মোবাইলঃ +৮৮ ০১৮১৩ - ৮১৮৬৯৬
ফোনঃ +৮৮ ০২ - ৫৫০১৩৯৩৯
ইমেইলঃ shwapnerbd@gmail.com