shopner bd
মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১ । ৭ বৈশাখ ১৪২৮ | ৭ রমজান ১৪৪২
×

একটি ইউনিয়নই একটি সমিতি!

  স্বপ্নের বাংলাদেশ ডেস্ক    ৩১ ডিসেম্বর ২০২০, ১৮:২৯

একটি ইউনিয়নই একটি সমিতি

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার একটি ইউনিয়ন বদরখালী। ১৮ বর্গ কিলোমিটারের একটি ইউনিয়নই একটি সমবায় সমিতি। নয় দশক ধরে বৃহদায়তন প্রাথমিক সমবায় সমিতির মাধ্যমে গ্রাম ও ইউনিয়নের প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। 

স্থানীয় সরকার কিংবা সরকারের বিভিন্ন বিভাগ এই ইউনিয়নের উপস্থিত থাকলেও সমিতির দেড় হাজার সদস্যের প্রধান আস্থা ও নির্ভরতার স্থান বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি। দীর্ঘদিনের পুরোনো ও বৃহৎ এ সমিতি দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সমবায় সমিতির স্বীকৃতিও পেয়েছে। 

ব্রিটিশ আমলের কক্সবাজার মহকুমার অধীন চকরিয়া থানার অধীন বদরখালী মৌজা ছিল সম্পূর্ণ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকার কিছু ভূমিহীন মানুষদের পুনর্বাসিত করা হয় ওই বনাঞ্চলে। বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি গড়ে তোলার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার একজন সমবায় ইন্সপেকটর নিয়োগ দেন। প্রায় ২৬২ জন ব্যক্তিকে নিয়ে গড়ে ওঠা সমিতি এখন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড়  সমবায় হিসেবে স্বীকৃত। 

একটি বৃহৎ সমিতিই ১৮ বর্গ কিলোমিটারের একটি ইউনিয়নের জন্ম নেয় ১৭৭২ সালে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মধ্যে থেকেও একটি সম্পূর্ণ ইউনিয়ন পরিচালিত হয় সমিতির মাধ্যমে। কৃষি, অর্থনীতি, চিকিৎসা, শিক্ষা ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পরিচালিত হলেও এর গোড়াপত্তন ঘটায় সমবায়। সময়ের পরিক্রমায় সমিতির সদস্য সংখ্যা দেড় হাজারে উন্নীত হয়েছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনা এখনো অটুট রয়েছে ৫ হাজার ৭০০ পরিবারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বৃহৎ এই সমবায় ইউনিয়নে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯২৯ সালে চকরিয়া এলাকার ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে ভূমিহীন মানুষদের বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে ২৬২ জন ব্যক্তিকে ভূমি বরাদ্দের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয় বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি। কালের পরিক্রমায় এই সমিতির সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫০০ জনে। ৩ হাজার ৭৭৭ একর জমি সমিতির সদস্যদের সমভাবে বণ্টন করা রয়েছে। সমিতির অধীনে আরও ৭৫৫ একর জমি বন্দোবস্তী পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সমিতির অধীনে রয়েছে আরও বেশ কিছু জমি। গত কয়েক বছর ধরে বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থিতি বাবদ এক হাজার ২০০ টাকা ছাড়াও সমিতির সদস্যদের আয় থেকে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা লভ্যাংশ (জমির অনুপাতে) সমানভাবে বণ্টন করা হয়। 

এছাড়াও সমিতির নামে স্থায়ী বন্দোবস্ত পাওয়া জমির খাজনা, রক্ষণাবেক্ষণ, মাদরাসা, মক্তব, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা কাজে সমিতির বার্ষিক বাজেট ধরা হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা। সদস্যদের নিজস্ব জমি ছাড়াও সমিতির নিজস্ব প্রায় হাজার একর জমি রয়েছে। যা সামাজিক কর্মকাণ্ড, সড়ক যোগাযোগ, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য জমিতে কৃষি ছাড়াও মৎস্য চাষে সমিতির পক্ষ থেকে চাষাবাদ করে সমিতির আয় নির্বাহ করা হয়। কৃষি, মৎস্য চাষ, চিংড়ি ঘের তৈরি কিংবা সামাজিক নানান কর্মকাণ্ডে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমিতির পক্ষ দেয়া হয় সহজ শর্তে ঋণ। অসচ্ছল পরিবারের নানান কর্মকাণ্ডে বিনা শর্তে ঋণ কিংবা অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য একটি অনন্য সমবায় হিসেবে ইতোমধ্যে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে বদরখালী সমিতি। 

বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতির সম্পাদক এ কে এম ইকবাল বাদুরি জানান, বদরখালী সমিতি দেশের সবচেয়ে অগ্রসরমান সামাজিক সমবায় হিসেবে স্বীকৃত। সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সমবায়টি প্রায় নয় দশক ধরে কাজ করে যাচ্ছে। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত কারণে জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় আয়ের উৎসও কমে আসছে। সমিতির সীমিত থাকলেও জমির পরিমাণ না বাড়ায় জনশক্তি হিসেবে বিদেশে অবস্থান, উচ্চতর পড়াশোনার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জীবিকায় চলে যাচ্ছে এখানকার মানুষ। বদরখালী ইউনিয়নের সামাজিক সমবায় পদ্ধতিকে কাজে লাগানো গেলে সারাদেশের কাছে এটি একটি মডেল হিসেবে হাজির করানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। 

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সমবায় পদ্ধতিতে জমির বণ্টন থাকায় কৃষি উৎপাদনেও মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য নেই বললেই চলে। ইউনিয়নের সকল পরিবারের প্রায় সম পরিমাণ জমি থাকায় চাষাবাদেও ধারাবিহকতা রয়েছে। বদরখালী অর্থকরী সম্পদে সমৃদ্ধ একটি ইউনিয়ন। ধান, পান, লবণ, মাছ, গাছ, চিংড়ি, তাঁত, কাঁকড়া, শুটকিসহ কৃষিজ নানান কর্মকাণ্ড। উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় সবজি চাষ না হলেও ধান, মৎস্য, পান ও লবণ চাষে অপরাপর ইউনিয়ন থেকেও এগিয়ে রয়েছে অঞ্চলটি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন  জেলায় পাঠানো হচ্ছে এখানকার মানুষের উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য। বিশেষ করে পান এখানকার পান দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। বদরখালীর বিস্তীর্ণ ভূমি জুড়ে রয়েছে মিঠা পানের বরজ। বদরখালীর মোট জমির অর্ধেকেরও বেশি জমিতে বোরো ও আমন ধানের চাষ হয়। ইউনিয়নের মোট জমির অর্ধেক জমিতে শুষ্ক মৌষুমে লবণের চাষ হয়। ব্যক্তি পর্যায়ের বাইরে অধিকাংশ জমিতে সমবায় থেকেই চাষাবাদ করে জমির মালিকরা। বছর শেষে লভ্যাংশ আকারে আয় তুলে নেয় তারা। তিন দিক থেকে বেষ্টিত করে রাখা নদী ও বঙ্গোপসাগরের কারণে  মৎস্য সম্পদে ভরপুর বদরখালী ইউনিয়ন। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক মাছ ছাড়াও পুকুর ও ঘেরে মৎস্য চাষ এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমৃদ্ধ করেছে। ব্যক্তি ও সামাজিক কর্মসূচিতে পরিচালিত প্রায় শতাধিক চিংড়ি ঘের রয়েছে সারাদেশের চিংড়ির পোনা উৎপাদন এবং চিংড়ি রফতানির অন্যতম উৎস বদরখালীর মৎস্য চাষীরা। ব্যক্তি পর্যায়ে সীমিত উৎপাদন ছাড়া অধিকাংশ ঘেরই সমবায় থেকেই পরিচালিত হয়। সামুদ্রিক মাছের শুটকি তৈরি ছাড়াও সমিতির সহযোগিতায় ঋণ কিংবা আর্থিক সহযোগিতায় কৃষিজ কর্মকাণ্ড এই ইউনিয়নের মানুষকে করেছে স্বাবলম্বী।  

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র

প্রধান সম্পাদকঃ মোহাম্মদ আবুল বশির
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মনির হোসেন
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়ঃ ৩৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫

মোবাইলঃ +৮৮ ০১৮১৩ - ৮১৮৬৯৬

ফোনঃ +৮৮ ০২ - ৫৫০১৩৯৩৯

ইমেইলঃ shwapnerbd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০২১ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।