১২ লাখ বিদেশি শ্রমিক ফেরত পাঠাবে সৌদি

মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যাপক মূল্যপতন ঘটেছে। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক সংকট লাঘবে বেশকিছু উচ্চাভিলাষী প্রকল্প স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সৌদি আরব। এর ধারাবাহিকতায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিককে পর্যায়ক্রমে ফেরত পাঠাবে দেশটি, চলতি বছরের শেষ নাগাদ যার সংখ্যা দাঁড়াবে ১২ লাখ। আর ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকের বড় একটি অংশই প্রবাসী বাংলাদেশি।
সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়া এবং চলমান অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সৌদি আরব থেকে ১০ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসীকে দেশে ফিরে আসতে হতে পারে। দূতাবাসের আশঙ্কা, ২০৩০ সালের মধ্যে নিজ দেশের নাগরিকদের মাধ্যমে ৭০ শতাংশ বিদেশি কর্মী প্রতিস্থাপনের নীতিও এর আরেকটি কারণ হতে পারে। শ্রমিক ফেরত আসার আশঙ্কার বিষয়টি উল্লেখ করে গত মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠিও পাঠিয়েছে দূতাবাস।
গত সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশে ফিরতে আগ্রহী প্রবাসী শ্রমিকদের ফেরত আনার ব্যাপারে মতৈক্যে পৌঁছেছে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব। উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ফোনালাপে বাংলাদেশ সৌদি আরব থেকে শ্রমিক ফিরিয়ে আনতে সম্মতি দিয়েছে। আর বাংলাদেশের অনুরোধে পর্যায়ক্রমে এ শ্রমিকদের ফেরত পাঠাতে সম্মত হয়েছে সৌদি আরব।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে প্রায় এক লাখ ২৯ হাজার বাংলাদেশি কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। এর মধ্যে ৯৫ হাজার ৩৮৪ জনই গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। দেশটিতে প্রায় ২১ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক বিভিন্ন পেশায় কর্মরত।
২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরবের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের কারণে সেখানে থাকা বৈধ ও অবৈধ অন্য দেশের নাগরিকদের বিতাড়নের নীতি নিয়েছে দেশটির সরকার। এখন আর সাধারণ ক্ষমা করে পুনরায় বৈধ হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না সৌদি আরব সরকার। এ পরিস্থিতিতে গত বছরের শেষ দিক থেকে সৌদিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ, হুরুব হয়ে যাওয়া, অবৈধ হয়ে যাওয়া অনিবন্ধিত বাংলাদেশিদের তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করে। দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ভাগ করে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বাংলাদেশিদের নিবন্ধনের আহ্বান জানানো হয়। তখন থেকেই সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনসুলেট প্রতিনিয়ত এসব বাংলাদেশির তালিকা প্রণয়নে কাজ করছে। সৌদি আরব বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে। শুরুতে অবৈধ ও আনডকুমেন্টেড বাংলাদেশিদের নিয়ে আসতে বলছে। তারপর হয়তো বৈধভাবে যেসব বাংলাদেশি রয়েছেন, তাদের বিভিন্ন উপায়ে সৌদিতে টেকা কঠিন করে দেবে দেশটি।
সৌদি আরবের ২০৩০ ভিশন অনুযায়ী, পুরো সৌদির শ্রমবাজারে ৭০ শতাংশ সৌদি আরবের নাগরিককে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির। এটি বাস্তবায়নে সব দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের ক্রমান্বয়ে ছাঁটাই করে নিজ দেশে ফেরত পাঠাবে সৌদি সরকার। এরই মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বাধামূলক ব্যবস্থা নেয়া শুরু করেছে সৌদি সরকার। বিশেষ করে করের ক্ষেত্রে। সৌদিতে বিদেশি কর্মীদের পরিবারের ওপর মাসিক চার্জ আরোপ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ইকামার ফি বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে টিউশন ফি বাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি কর বাড়িয়ে দিয়েছে, যার কারণে এরই মধ্যে মিসরের ১১ লাখ নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা সৌদি ছেড়ে চলে গিয়েছেন। আরো দেশের নাগরিকরা সৌদি ছাড়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। এসব নাগরিকের বেশির ভাগই পেশাজীবী। বিভিন্ন উপায়ে অভিবাসীদের বের করে দিলেও সৌদি আরবের বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি নাগরিকদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়েই চলেছে।