সংকটে অর্থনীতির মেরুদণ্ড রেমিট্যান্স

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে চলতি বছরের মার্চ মাস থেকেই দেশে হঠাৎ থমকে যায় সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এতে ধস নামে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে। কিন্তু এ পরিস্থিতির মধ্যেও থেমে থাকেনি রেমিট্যান্স প্রবাহ। বরং করোনার মধ্যে অন্য সময়ের চেয়েও বেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ফলে থমকে যাওয়া অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়েছে।
মহামারির কারণে বিভিন্ন দেশ থেকে কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন প্রবাসীরা। কিন্তু এর পরও কমেনি রেমিট্যান্সের পরিমাণ। উল্টো প্রতি মাসেই হচ্ছে নতুন রেকর্ড। আগের তুলনায় চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ৪৮ শতাংশের বেশি। সেই সুবাদে সেপ্টেম্বর শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩৯ দশমিক ৩১ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৯৩১ কোটি ডলার। এভাবেই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স।
পোশাক খাতের পরই বিদেশি মুদ্রার দ্বিতীয় বৃহৎ উৎস রেমিট্যান্স। পোশাক সর্ববৃহৎ উৎস হলেও পণ্যটি তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম পরিশোধ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। আবার বিদেশি মুদ্রার আরেকটি উৎস ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্সের (ওডিএ) অবদানও যৎসামান্য। একই অবস্থা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহেও। সব মিলিয়ে প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রা রিজার্ভ ও এর কার্যকারিতা অনেক বেশি।
জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈধ ও অবৈধ বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় এক কোটি। এর মধ্যে সৌদি আরবেই রয়েছেন প্রায় ২০ লাখ। বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীরা তাদের আয়ের বড় একটা অংশ দেশে থাকা পরিবারের কাছে পাঠান। আর এ অর্থ কেবল তাদের পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটায় তা নয়, নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দেশের যেসব এলাকা থেকে প্রবাসীরা বেশি প্রবাসে গিয়েছেন সেসব এলাকার জীবনযাত্রার পরিবর্তন দেখলেই বিষয়টি বোঝা যায়।
সামগ্রিকভাবে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে রফতানি, বিদেশি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাবাদ অর্থপ্রবাহের চেয়ে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থপ্রবাহ অর্থনীতির উন্নতি সাধন করছে অনেক গভীর থেকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশি মুদ্রা রিজার্ভ সমৃদ্ধ করার অন্যতম মাধ্যম হলো প্রবাসী আয়। অর্থনীতিতে রিজার্ভের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর রিজার্ভের অন্যতম স্তম্ভ হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এ হিসেবে অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভও হলো রেমিট্যান্স। বাস্তবতা হলো অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের প্রভাব বহুমাত্রিক। ব্যক্তি মানুষ থেকে শুরু করে গোটা আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে গ্রামীণ রূপান্তরে বড় ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান আরো বলিষ্ঠ করা সম্ভব এবং প্রয়োজন।
চলতি বছরে এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা ক্রমেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দারিদ্র্য হ্রাস, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে তুলতে রেমিট্যান্স প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ অবদান আরো বেড়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে রেমিট্যান্সের অংশ ছিল ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ৩ জুন দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ছাড়ায়। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ২৪ জুন সেই রিজার্ভ আরো বেড়ে ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার অতিক্রম করে। এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই ৩০ জুন রিজার্ভ ৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। এরপর ২৮ জুলাই রিজার্ভ ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের ঘরও অতিক্রম করে। তিন সপ্তাহ পর গত ১৭ আগস্ট রিজার্ভ ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলার ছাড়ায়। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ যা ৩ হাজার ৯৩১ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। এতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স।
চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রেকর্ড ২৫৯ কোটি ৮২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠান প্রবাসীরা। এরপর আগস্টেও ১৯৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে আসে। সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স ২ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে ২১৫ কোটি ১০ লাখ ডলারে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসীরা ৬৭১ কোটি ৩১ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৪৫১ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। এ হিসাবে চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ৪৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
বৈধ চ্যানেলে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রধান মাধ্যম ব্যাংকিং খাত। সেপ্টেম্বরে দেশের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ২১৫ কোটি ১০ লাখ ডলার।
শুধু চলতি বছরই নয়, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি কয়েক বছর ধরেই অব্যাহতভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ১ হাজার ৮২০ কোটি ৫০ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৯৬ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৯৮ কোটি ১৬ লাখ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৯৪ লাখ ডলার।
রেমিট্যান্সের বড় প্রবৃদ্ধিতে বাজারে চাহিদার চেয়ে বেশি ডলার জমা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে কয়েক বছর ধরে ডলার বিক্রি করলেও কয়েক মাস ধরে ব্যাংকগুলো থেকে প্রতিনিয়তই ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ডলার আসায় সরকারের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও উদ্বৃত্তের ধারা ফিরে এসেছে। আগস্ট শেষে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সব মিলিয়ে রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবৃদ্ধিতে উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করলেও করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারীতে আর্থিক বিপর্যয়ে পড়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এক কোটির বেশি বাংলাদেশি। সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালু হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশ থেকে দেশে আসা প্রবাসীদের বড় অংশই কর্মস্থলে ফিরে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন।