মোঃ রাসেল আহম্মেদ, লিসবন পর্তুগাল ১৬ মে ২০২১, ১৫:০২
পর্তুগীজ সরকারের জাতীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রকল্প হেলদি নেইবারহুড এর বিজয়ীদের নাম আজ আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করে পর্তুগালের প্রধান মন্ত্রী আন্তোনিও কস্তা। লিসবনের অদুরে বারেইরো শহরে স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকাল ৪ টায় একটি অনারম্ভর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ী প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করা হয়।
প্রথমবারের মত লিসবনে বাংলাদেশীদের প্রতিষ্ঠান "পর্তুগাল মাল্টিকালচ্যারাল একাডেমি" এই প্রকল্পের জন্য বিজয়ী এবং মনোনীত হয়। যার ফলে আগামী একবছর সরকারি অর্থায়নে বাংলাদেশ কমিউনিটি সহ লিসবনের অভিবাসীদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
এই প্রকল্পের আওতায় মাল্টিকালচ্যারাল একাডেমিতে সপ্তাহে তিন দিন নিদিষ্ট সময়ে বাংলাদেশী একজন ডাক্তার ও নার্স স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সহযোগিতায় কমিউনিটির বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা ও পরামর্শ প্রদান করবে। তাছাড়া বছর ব্যাপী বিভিন্ন সেমিনার, স্বাস্থ্য বিষয়টি কর্মশালা, সচেতনতা তৈরি সহ এই খাতের উপর কয়েকটি জরিপ পরিচালনা করে তা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রতিবেদন প্রদান করা হবে।
_5.jpg)
সমগ্র পর্তুগালের ৭৭৪ টি প্রতিষ্ঠান এতে অংশগ্রহণ করে এবং ২৪৬ টি প্রতিষ্ঠান বিজয়ী হয় যারা আগামী এক বছর তাদের প্রস্তাবিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। বাংলাদেশী এই প্রতিষ্ঠান ৬৭ তম স্থান অর্জন করে প্রকল্পের জন্য মনোনীত হয়। এই প্রকল্পের জন্য পর্তুগীজ সরকার ১০ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করেছে।
উল্লেখ ২০১৮ সালে বাংলাদেশী তরুণদের উদ্যোগে, সুপরিসর ক্যাম্পাস নিয়ে গড়ে উঠেছে "পর্তুগাল মাল্টিকালচ্যারাল একাডেমি"। যেখানে মাত্র দুই মাসের পর্তুগিজ কোর্স সম্পূর্ণ করে সহজে অর্জন করতে পারে পর্তুগিজ ভাষা শিক্ষা সার্টিফিকেট লেভেল এ১ এবং এ২ যা ভাষা দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি পর্তুগিজ নাগরিকত্ব আবেদনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ও অপরিহার্য।
নাগরিকত্ব আবেদনের অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে পর্তুগিজ ভাষা দক্ষতার প্রমান বা সার্টিফিকেট প্রদান। যা আগে অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার ছিল কেননা বছরে মাত্র ২/১ টি কোর্স চালু হতো সরকারি উদ্যোগে। আর এই কোর্সের জন্য মানুষকে অপেক্ষা করতে হতো বছরের পর বছর।
অনেকেই আছেন নাগরিকত্ব আবেদনের সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও এই সার্টিফিকেট না থাকার ফলে নাগরিকত্ব আবেদন করতে পারছে না। বাংলাদেশী কমিউনিটি এদেশে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে বসবাস করে আসছে। দীর্ঘ দিন ধরে অত্যন্ত সুনামের সাথে এদেশে বিভিন্ন খাতে ব্যবসা বানিজ্যে প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষ করে পর্তুগীজ সূবিনিয়র ও হালাল মাংসের বাজার বহু পূর্বে থেকেই বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের দখলে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশী কারী শিল্পের ব্যাপক উন্নতি ও চাহিদা তৈরী হয়েছে রাজধানী লিসবন সহ সমগ্র পর্তুগাল জুড়ে। তাছাড়া বর্তমানে অনেকেই এদের কৃষি ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোগ গড়ে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
তথ্য মতে পর্তুগালে বর্তমানে ১৩৭ টির ও বেশী দেশের অভিবাসী বসবার করছে। পর্তুগিজ সরকার অনুমোদিত ভাষা শিক্ষার এই কোর্সটি যেকোন দেশের অভিবাসী দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সম্পূর্ণ করতে পারে। ফলে পর্তুগালে অবস্থান রত বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের কাছে বাংলাদেশীদের এখন ভিন্ন পরিচয় বহন করে।
বর্তমানে কোর্সটিতে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মুখে ফুটে উঠেছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল ছিল এই কোর্সটি পূর্বের সময়ে। কেননা বছরের পর বছর অপেক্ষা করে, পর্তুগীজ টু পর্তুগীজে কোর্সটি অনুষ্ঠিত হতো যা অনেকের জন্য অসুবিধার কারন ছিল। কিন্তু এখন সহজেই সুবিধাজনক সময়ে ইংলিশ টু পর্তুগীজে এই ভাষা শিক্ষা কোর্সটি সম্পূর্ণ করতে পারছেন বাংলাদেশী অভিবাসী সহ বিশ্বের ৩৫ টি দেশের অভিবাসীগন।
একাডেমির একজন পর্তুগিজ শিক্ষিকা তেরেসা'র সাথে আলাপকালে উঠে আসে নানান খুঁটি নাটি বিষয়। অভিবাসী হিসেবে সেই দেশের ভাষা শিক্ষার গুরুত্বারোপ করেন তিনি। ভাল ভাষা আয়ত্ত থাকলে কাজের ব্যবস্থাসহ ভিন্ন দেশে বা পরিবেশে সহজে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া যায়। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের ভাষা শিক্ষার আগ্রহে তিনি অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছেন। পাশাপাশি এমন সুন্দর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করার জন্য কতৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এছাড়া রয়েছে মাত্র ২৯ ইউরোতে পর্তুগীজ বেসিক কোর্স যা নতুনদের জন্য খুবই চমৎকার তাদের প্রাথমিক ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়নে। কাজকর্ম ব্যবসা বানিজ্য অথবা দৈনন্দিন বিভিন্ন প্রয়োজনে স্থানীয় অফিসে টুকিটাকি ভাষা জানা থাকলে তা খুবই কাজে আসে।
তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে অভিবাসীদের সহযোগিতায় অভিবাসন বিষয়ক একাধিক আইনজীবী যারা সপ্তাহে দুই দিন নিদিষ্ট সময়ে আইনি পরামর্শ ও সেবা দিয়ে থাকেন। ইমিগ্রেশন আবেদন, বিভিন্ন অফিসে অ্যাপোয়েন্টমেন্ট নিধারন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অনুবাদ ও সত্যায়ন সহ পর্তুগীজ নাগরিকত্ব আবেদনে সেবা ও সহযোগিতা প্রদান করা হয়।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে প্যানডেমিকের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ কমিউনিটির শিশুদের জন্য ছুটির দিনে মাতৃভাষা বাংলা এবং আরবি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম ছিল যা এখন করোনা পরিস্থিতি ফলে বন্ধ রয়েছে এবং খুব শিগগীরই পূনরায় আবার তা চালু হবে।
_1.jpg)
করোনা ভাইরাস মহামারী সংক্রমণ শুরু হলে গড়ে তোলা হয় জরুরি খাদ্য সহযোগিতা যা বিগত এক বছর থেকে চলমান রয়েছে সপ্তাহে একদিন। স্থানীয় ফুড ব্যাংকের সহযোগিতায় এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে যেখানে ২০ টি দেশের ১ হাজারের বেশী মানুষ অনলাইনে রেজিষ্ট্রেশন করেছে সহযোগিতা গ্রহনের জন্য। প্রতি সপ্তাহে এখন প্রায় ১শ থেকে ১শ ২০ জন মানুষ সহযোগিতা গ্রহন করছেন। পর্তুগাল ইমিগ্রেশন হাই কমিশন এবং স্থানীয় একটি সংস্থার আর্থিক সহযোগিতায় তা জরুরি অবস্থা থাকা পর্যন্ত চলমান থাকবে।
লিসবনের তথা পর্তুগালের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংস্থার সাথে একসাথে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। যার মাধ্যমে ভাষা দক্ষতা এবং কর্ম দক্ষতা উন্নয়ন মূলক প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগে অভিবাসীদের উন্নয়নে কর্মশালা, তথ্য বিনিময় ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে। ফলে বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা উপকৃত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পর্তুগীজ সরকারের হেলদি নেইবারহুড প্রোগ্রামে জয়লাভ করেছে ফলে এখন থেকে সপ্তাহে তিন দিন একজন বাংলাদেশী ডাক্তার ও নার্স থাকবেন প্রতিষ্ঠানটিতে কমিউনিটই স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য যাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকবে লিসবনের স্থানীয় স্বাস্থ কেন্দ্র। তাছাড়া অভিবাসীদের বিভিন্ন সেবা নিশ্চিত এবং সমস্যা সমাধান করতে একই সময়ে উপস্থিত থাকবেন স্থানীয় অভিবাসন কর্মী ও এনথ্রপলজিষ্ট।
উল্লেখ ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে পরিদর্শন করেছিলেন পর্তুগীজ ইমিগ্রেশন হাই কমিশনার। তিনি সার্বিক পরিস্থিতি দেখে এর উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদান করেছিলেন। লিসবনে বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের এমন সময়োপযোগী পদক্ষেপে বাংলাদেশ কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গও এটিকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। এমন উদ্যোগে পর্তুগালে বাংলাদেশ কমিউনিটির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এমনটা প্রত্যাশা করছেন পর্তুগাল প্রবাসী বাংলাদেশীরা।
প্রধান সম্পাদকঃ মোহাম্মদ আবুল বশির
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মনির হোসেন
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়ঃ ৩৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫
মোবাইলঃ +৮৮ ০১৮১৩ - ৮১৮৬৯৬
ফোনঃ +৮৮ ০২ - ৫৫০১৩৯৩৯
ইমেইলঃ shwapnerbd@gmail.com