স্বপ্নের বাংলাদেশ ডেস্ক ০৩ জুন ২০২১, ১৯:১৫
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুরকে শ্রমবাজার নিয়ে উভয়সংকটে ফেলে দিয়েছে কভিডের প্রাদুর্ভাব। করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে সিঙ্গাপুর। ফলে দেশটিতে দক্ষিণ এশিয়া থেকে শ্রমিক সরবরাহ এখন পুরোপুরি বন্ধ। যদিও দেশটির অভিবাসী শ্রমিকনির্ভর আবাসন ও শিল্প খাতে শ্রমিকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এতদিন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোই পূরণ করে এসেছে। ফলে মহামারীর বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখাটাই সিঙ্গাপুরের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।
সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে সিঙ্গাপুরে আগমনে নিষেধাজ্ঞা জারির পর থেকেই দেশটি শ্রমিক সংকটে ভুগছে। দেশটির অর্থনীতিতেও এরই মধ্যে এর ছাপ পড়তে শুরু করেছে।
নিক্কেই এশিয়ান রিভিউর সাংবাদিক কেনতারো ইওয়ামোতোর ভাষ্যমতে, সিঙ্গাপুরের মোট শ্রমশক্তির এক-তৃতীয়াংশই গড়ে উঠেছে অভিবাসী শ্রমিকদের দিয়ে। বিশেষ করে দেশটির নির্মাণ ও জাহাজ শিল্পের মতো ভারী খাতগুলো বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে কম খরচে পাওয়া শ্রমিকদের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে আগমন বন্ধ করে দেয়ার আগে থেকেই ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজার। কঠোর ভ্রমণ নীতিমালা এবং অনেক শ্রমিক কর্মস্থল ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে এ সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল। কেনতারো ইওয়ামোতো এএনআইকে জানিয়েছেন, এ সমস্যার কারণে দেশটিতে নির্মাণ খাতের অনেক প্রকল্প এখন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব প্রকল্প এক বছর পর্যন্তও বিলম্বিত হয়েছে। এ ঘাটতির কারণে বর্তমানে সিঙ্গাপুরে শ্রমব্যয় যেমন বেড়েছে তেমনি শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ারও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হিউম্যানিটারিয়ান অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন ইকোনমিকসের কর্মকর্তা ডেসিরি লিয়ংয়ের বরাত দিয়ে নিক্কেই এশিয়া জানিয়েছে, গত বছর থেকেই দেশটিতে শ্রমিকরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণ শিফটেও কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। একেকটি শিফটের ব্যাপ্তি ছিল ৮ ঘণ্টা করে। এসব শ্রমিককে অতিরিক্ত শিফটে কাজ করতে হয়েছে সপ্তাহের অন্তত অর্ধেকটা সময়জুড়ে।
সিঙ্গাপুর সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির নির্মাণ প্রকল্প, শিপইয়ার্ড ও বিভিন্ন কলকারখানায় গত বছর অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে ১৬ শতাংশ। বছর শেষে খাতগুলোয় কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা নেমে এসেছে ৩ লাখ ১১ হাজারে। এ সময় দেশটিতে অভিবাসী শ্রমিকের মোট সংখ্যা কেমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ।
বর্তমানে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা কমছে। তবে এখনো সিঙ্গাপুরে দক্ষিণ এশিয়া থেকে স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণকারী ও দীর্ঘমেয়াদি পাসধারী শ্রমিক আগমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা চালু রয়েছে। নিক্কেই এশিয়ায় গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সিঙ্গাপুর সরকারের বরাত দিয়ে জানানো হয়, দেশটিতে এবার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে ৪-৬ শতাংশের মধ্যে। তবে শিল্পোৎপাদন ও আবাসন খাতে শ্রমিক সংকট অব্যাহত থাকলে প্রবৃদ্ধির গতি অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে দেশটির সরকার।
দেশটির শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায়, সিঙ্গাপুরের নির্মাণ ও জাহাজ শিল্পে বর্তমানে মারাত্মক শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকটকে আরো প্রকট করে তুলেছে দক্ষিণ এশিয়া থেকে অভিবাসী শ্রমিকদের আগমনের ওপর জারীকৃত বিধিনিষেধ। গত বছর দেশটির নির্মাণ খাতের সংকোচন হয়েছে ৩৬ শতাংশ। শ্রমিকদের বসবাসস্থলে কভিড-১৯-এর গুচ্ছ সংক্রমণের কারণে নির্মাণ খাতের বিভিন্ন সাইট পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এ পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে উঠলেও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) নির্মাণ খাতের সংকোচন অব্যাহত ছিল। এ সময় খাতটির সংকোচন হয়েছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ।
নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সিঙ্গাপুরের আবাসন খাতে বিক্রির গতি কমে আসার ঝুঁকি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সেবা ফ্যাসিলিটির উদ্বোধনও পিছিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া দেখা দিয়েছে সার্বিক ভোগব্যয় কমে আসার আশঙ্কাও।
এ অবস্থায় সিঙ্গাপুরের বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন এখন দেশটির সরকারের প্রতি দক্ষিণ এশিয়া থেকে শ্রমিক আগমন পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছে। এ বিষয়ে তাদের যুক্তি হলো যদি এ প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকে, তাহলে দেশটির আবাসন, হাসপাতাল ও ট্রানজিট লাইন-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর কার্যক্রমে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটবে।
এদিকে শ্রমিক সংকটের কারণে দেশটিতে এখন কর্মস্থলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে। হিউম্যানিটারিয়ান অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন ইকোনমিকস জানিয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাছ থেকে দিনে ১৪-১৬ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ছয়দিন টানা কাজ করানোর অভিযোগ আসছে। গত মাসের মাঝামাঝি সিঙ্গাপুরের নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্ট ছয়টি বাণিজ্য সংগঠন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশটিতে বর্তমানে অবস্থানরত শ্রমিকরা তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে কাজ করছেন। এতে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা দেখা দেয়ারও আশঙ্কা বাড়ছে।
প্রধান সম্পাদকঃ মোহাম্মদ আবুল বশির
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মনির হোসেন
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়ঃ ৩৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫
মোবাইলঃ +৮৮ ০১৮১৩ - ৮১৮৬৯৬
ফোনঃ +৮৮ ০২ - ৫৫০১৩৯৩৯
ইমেইলঃ shwapnerbd@gmail.com