ই এম আকাশ ১০ আগস্ট ২০২৩, ১১:১৯
পিতা কাকে বলে? যিনি জন্ম দেন, লালন-পালন করেন এবং যার পরিচয়ে আমরা সমাজে পরিচিতি লাভ করি তাকেই পিতা বলে। ব্যক্তি মানুষের জন্য যেমন এটি সত্য, তেমনি একটি জাতির জন্যও এটি সত্য।
কেননা ব্যক্তি মানুষের মতো এই বিশ্বে জাতিরও সমাজ আছে। সেই সমাজে স্বীকৃতি ও উপযুক্ত সম্মান পেতে হলে জাতিরও একটি পরিচয় থাকা চাই। আর স্বাধীনতা ব্যতীত জাতির পরিচয় বিশ্বসভায় স্বীকৃতি লাভ করে না।
বঙ্গবন্ধু আমাদের সেই স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। তাঁর পরিচয়েই বাঙালি জাতি বিশ্বসভায় আপন পরিচয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি একদিকে যেমন দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, একটি জাতি রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন, তেমনি তাঁর স্বল্পকালীন শাসনামলের মধ্যেই বিশ্বের ৩২টি দেশ এবং জাতিসংঘসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি এনে দিয়েছেন। তাঁর জন্যই আজ আমরা বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন ও গর্বিত জাতির স্বীকৃতি পেয়েছি।
বঙ্গবন্ধুই প্রথম জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলা আজ বিশ্বের অন্যতম স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ভাষা। আমাদের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি আজ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। বাংলাভাষার এই যে বিশ্বময় স্বীকৃতি এটির শুরুটা তিনিই করেছিলেন জাতিসংঘে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে। তাঁর আগে কেউই এত বড় প্রতিষ্ঠানে, এত দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সামনে এত সাহসিকতার সঙ্গে বাংলা উচ্চারণ করতে পারেনি। এমনকি তাঁকে নির্মমভাবে হত্যার পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেছে, প্রতিবছর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিয়েছে, কিন্তু বাংলায় ভাষণ দিতে সাহস করেনি। বঙ্গবন্ধু জীবনের শুরু থেকেই বাঙালি জাতির একটি স্বাধীন পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। এ জন্যই তিনি আমাদের জাতির পিতা।
প্রিয় শিশুরা! তোমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে : আমাদের তো পিতামাতা আছে, সুতরাং জাতির পিতার আবার প্রয়োজন কী?
তোমরা নিশ্চয়ই হজরত আদমের (আ.) নাম শুনেছো, তাই না? তাঁকে মানব জাতির আদি পিতা বা মানবজাতির পিতা বলা হয়। তোমরা হজরত ইব্রাহিমের (আ.) নামও নিশ্চয়ই শুনে থাকবে? তাঁকে মুসলিম জাতির পিতা বলা হয়। এভাবে বিশ্বে আরও কিছু নাম তোমরা জেনে থাকবে, যেমন- জর্জ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রমুখ। এঁরা যথাক্রমে আমেরিকা, ভারত ও পাকিস্তানের জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃত। কেন তাদের ওইসব দেশের জাতির পিতা বলা হয়, তা কি তোমরা জানো? এঁরা ওইসব জাতির জনক এই জন্য যে, তাঁরা নিজ নিজ জাতির স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। একইভাবে আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব পিতামাতা থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির পিতা এই কারণে যে, তিনি বাঙালি হিসেবে আমাদের স্বাধীন পরিচয়ের স্বীকৃতি এনে দিয়েছিলেন।
এই বাংলাদেশ একদিন এরকম ছিল না। এই আমরা একদিন স্বাধীন দেশের নাগরিক ছিলাম না। তোমরা বড় হয়ে যখন এ দেশের ইতিহাস-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর লিখিত বইগুলো পড়বে, তখন জানতে পারবে এ দেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে কীভাবে বিভিন্ন বিজাতীয় শাসক দ্বারা শোষিত-নির্যাতিত হয়েছে। এসব অন্যায় আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমাদের পূর্বপুরুষরা রুখে দাঁড়িয়েছে। কেননা বাঙালি বীরের জাতি। কিন্তু দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পরও তারা নিজেদের একটি স্বাধীন সত্তা অর্জন করতে পারেনি শুধু যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে। বঙ্গবন্ধুর আগে কোনো নেতাই সমগ্র বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনি।
এ দেশটা ১৯০ বছর ইংরেজ শাসনের অধীনে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে আমাদের বাঙালি নেতারা বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্যভিত্তিক একটি স্বাধীন আবাসভূমির জন্য সংগ্রাম করেন। কিন্তু বাঙালিবিরোধী কুচক্রী মহল বাঙালি জাতির ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাঁধিয়ে দেয়। ধর্মের গোঁড়ামিতে বাঙালি জাতি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। আমাদের পূর্ববাংলার মানুষদের বুঝানো হলো যে, পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে এই অংশের কৃষকরা মুক্তি পাবে, তাদের খাজনা-ট্যাক্স কমে যাবে, জমিদার-মহাজন আর তাদের চ্যালা-চামুণ্ডাদের অত্যাচার থেকে বাংলার কৃষক মুক্তি পাবে। বলা হলো, তাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে চাকরি-বাকরি পাবে। অর্থাৎ কোনো শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায়-অত্যাচার থাকবে না। আমাদের পিতামাতারা সেই জন্য পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিলেন।
কিন্তু পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার পরপরই আমাদের পূর্বপুরুষরা বুঝতে পারলেন যে, তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। কেননা তারা দেখতে পেলেন ব্রিটিশরা চলে গেলেও যারা নতুন শাসক হলো তারা আরও বেশি খারাপ আচরণ করতে শুরু করল। এমনকি পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের মুখের ভাষা বাংলাকেও কেড়ে নিয়ে উর্দু চাপিয়ে দিতে চাইল।
বঙ্গবন্ধু শুরুতে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনে ছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, জাতির ওপর এই যে, পাকিস্তানি শাসকদের জগদ্দল চেপে বসেছে তা থেকে মুক্তি পেতে হলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার বিকল্প নেই। তিনি কাজ শুরু করলেন। শুরুতেই ভাষা আন্দোলনে নেমে পড়লেন। শাসকগোষ্ঠী তাকে গ্রেপ্তার করল। কিন্তু জেলখানার মধ্যেই তিনি অনশন শুরু করলেন। জনতার প্রবল আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাকে সাময়িকভাবে মুক্তি দিল। তিনি এই জাতির জন্য জীবনের ১৪টি বছর জেল খেটেছেন।
মুক্তি পেয়েই তিনি ছুটে বেড়ালেন বাংলার আনাচে-কানাচে। লক্ষ্য তার জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা। ১৯৬৬ সালে তিনি দিলেন বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ‘৬ দফা’। মাত্র ৫০ দিনে ৩২টি জনসভা করে তিনি ৬ দফার প্রতি সারা বাংলাদেশে গণজোয়ার সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেন। তিনি বললেন, আমরা আর নেতার ঐক্যে বিশ্বাস করি না, আমরা জনতার ঐক্যে বিশ্বাসী।
১৯৭০ সালে এ দেশে একটি নির্বাচন হলো এবং সেই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তিনি হয়ে গেলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চাইল না। তারা চাপিয়ে দিল একটি অন্যায়-অসম যুদ্ধ।
বঙ্গবন্ধু তাদের এই অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাই তিনি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে বাঙালিদের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন এই বলে-
...আর যদি একটি গুলি চলে
আর যদি আমার লোকেদের হত্যা করা হয়
তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইলো
প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।...
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
জয় বাংলা।
২৫ মার্চ, ১৯৭১। গভীর রাত। ঢাকার বুকে নেমে এলো হায়েনাদের ট্যাংকবহর। শুরু করল ইতিহাসের বৃহত্তম গণহত্যা। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন এই বলে-
“This may be my last message. From today Bangladesh is independent...”
শুরু হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হলো। কিন্তু তাঁর পরিকল্পনামাফিক তার অনুসারীরা মুজিবনগর সরকার গঠন করে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আর তাদের এ দেশীয় দোসরদের সঙ্গে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করলেন।
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি হানাদারদের জেল থেকে মুক্ত হয়ে জাতির কাছে ফিরে এলেন। অবশেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ণতা পেল।
ক্রমে ক্রমে তিনি সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিল। এ জন্য তিনি আমাদের জাতির পিতা।
লেখক : ই এম আকাশ
সভাপতি : কাতার বাংলা প্রেসক্লাব৷
প্রধান সম্পাদকঃ মোহাম্মদ আবুল বশির
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মনির হোসেন
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়ঃ ৩৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫
মোবাইলঃ +৮৮ ০১৮১৩ - ৮১৮৬৯৬
ফোনঃ +৮৮ ০২ - ৫৫০১৩৯৩৯
ইমেইলঃ shwapnerbd@gmail.com